সিলেট পাথর কোয়ারীগুলো খুলে দেওয়া প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২০

সিলেট পাথর কোয়ারীগুলো খুলে দেওয়া প্রসঙ্গে

দৈনিক দিনরাত:
সিলেট জেলার অন্তর্গত পাথর কোয়ারিগুলো দীর্ঘ একবৎসর যাবৎ বন্ধ রয়েছে। যে কোয়ারিগুলোতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও পাথর ব্যবসায়ীরা সরাসরি জড়িত। সিলেটের কোয়ারিগুলো এখন খাখা করছে। নেই শ্রমিক নেই ব্যবসায়ী, নেই পরিবহনসহ নানা সংশ্লিষ্ট যানবাহনগুলো। এ সকল ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে যে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল আজ তা ধ্বংস হতে চলেছে। ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও গাড়ি সহ বিভিন্ন পরিবহনের মালিকরা ঋণের দায়ে পথে বসতে শুরু করেছে। অনেকে আবার দেনার দায়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নব প্রতিষ্ঠিত শিল্পটি পরিবেশের দোহাই দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পাঁয়তারা চলছে। সিলেট জেলার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের বাঁচাতে অচিরেই খুলে দিয়ে মানুষের রুটি রোজির ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বাঁচানো সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। পরিবেশের পাশাপাশি মানুষকেও বাঁচতে দিতে হবে।
পাথর-বালু কেন্দ্রিক ব্যবসা চালু হওয়ার পর থেকে সিলেট, ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তিয়া, কানাইঘাট সব এলাকায় হাজার হাজার ক্রাশার মিল গড়ে উঠেছে। শত আশা ভরসা নিয়ে যে স্বপ্ন গড়ে উঠেছিল তা আঁতুড়ঘরে নষ্ট হতে চলেছে। এখন এই শিল্প বাঁচাতে হলে সিলেটের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এগিয়ে আসতে হবে। সিলেট বিভাগের স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিরা এ বিষয়কে স্পর্শকাতর হিসেবে আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
একদিকে কোভিড-১৯ মহামারীতে বিগত মার্চ মাস থেকে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত চলাফেরা ও ব্যবসা বাণিজ্যে প্রায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পর পর তিন বার বন্যা মানুষের মরার উপক্রম হয়েছে। কোয়ারি এলাকাগুলোর মানুষের নিরব দুর্ভিক্ষ চলছে। ছোট বড় নেই, এখানে সবাই এক কাতারে। কে কাকে দেখবে। দেখার মত অবস্থা কারো নেই। এমতাবস্থায় সিলেটের সকল শ্রেণি পেশার সজ্জন মানুষগুলোকে ওদের দু’র্দিনে প্রাণান্তর চেষ্টা করতে হবে। নইলে সামনে মহা বিপদের আশংকা আছে।
জীবনের প্রয়োজনে জীবিকা অত্যন্ত জরুরি। যেখানে মানুষ জন এত বড় মহামারীকে, স্বাস্থ্যবিধিকে আমলেই নিচ্ছে না। তাদের কথা, না খেয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধ করে মরবো। জীবিকা কত বড় ও কত নেহায়েত। আশা করি গুণীজন বুঝতে অসুবিধা হবে না। ডিম আগে না মুরগী আগে তাই নিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে পরিবেশবাদীরা পরিবেশের দোহাই দিয়ে খনিজ সম্পদ আহরণ করতে নানাভাবে আইনী হুমকী ও মামলা হয়রানি করতে চায়। কিন্তু আইন কি শুধু সিলেট জেলায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন পাথর বালু কোয়ারিগুলোতে দেদারছে পাথর বালু উত্তোলন হচ্ছে, সেখানে পরিবেশবাদী কিংবা আইনী প্রক্রিয়ায় বালাই নেই। নদী-নালা খাল-বিল থেকে দেদারছে বালু উত্তোলন হচ্ছে পাইপ দিয়ে মাইলের পর মাইল দূরত্বে নিয়ে বালু রাজির পাহাড় বানাচ্ছে। সেখানে কোন সমস্যা নেই। একদেশে দুই আইন কেমনে হয়?
‘সিলেট বিভাগীয় পাথর কোয়ারি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ ইতিমধ্যে সিলেটের সকল শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও গুণীজনদের নিয়ে দফায় দফায় মতবিনিময় ও আলোচনা সভা করে যাচ্ছে। কিভাবে পাথর কোয়ারীগুলোতে সরকারের পরিবেশের আইন/বিধি মেনে পাথর উত্তোলন করা যায় ও লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় টিকে থাকতে চায় তা নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে সিলেট সফরে এসেছিলেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেন। উনার সাথে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নেতারা দেখা করে তাদের সুখ-দুঃখের ও কষ্টের বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে কোয়ারি এলাকার অসহায় কর্মহীন মানুষের নীরব দুর্ভিক্ষের অবস্থার বিবরণ তুলে ধরেছেন। মাননীয় মন্ত্রী ধৈর্যের সহিত তাদের কথাগুলো শুনেছেন এবং তাদেরকে স্থানীয় মন্ত্রী ও জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের শরনাপন্ন হতে বলেছেন এবং তিনি ও বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন। প্রয়োজনে তাঁকে ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করার জন্য বলেছেন। ব্যবসায়ীরা তাঁর কথা মত তাঁকে ও অন্যান্য দফতরে দরখাস্ত সহ স্মারকলিপি দিতেছেন। দ্রুত এই ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সকলেই। সিলেট চার আসনের এমপি ও মাননীয় মন্ত্রী ইমরান আহমদের নির্বাচনী এলাকায় বেশির ভাগ পাথর ও বালুর কোয়ারীগুলো অবস্থিত বিধায় ওনাকে এই বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা নেওয়ার কথা বলেছেন।
২৪ আগস্ট (২০২০) সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় সিলেটের বৃটেনিয়া হোটেলের হল রুমে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আমন্ত্রণে সিলেটের জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও জেলা মহানগরের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হুসেন ও সিলেট চেম্বারের সভাপতি এটিম শুয়েব আহমদসহ সিলেট সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ ও জৈন্তিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান কামাল আহমদ সহ অন্যান্য নেতারা ও স্থানীয় সকল উপজেলার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সভায় একটাই দাবী ছিল, অচল পাথর কোয়ারীগুলোকে দ্রুত সচল করার লক্ষে মন্ত্রী এমপি ও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দ্রুত ভার্চুয়াল আলোচনা ও প্রধানমন্ত্রীর নিকট উক্ত কোয়ারি এলাকার অবস্থা তুলে ধরার জন্য। উপস্থিত প্রধান অতিথি ও প্রধানবক্তা ও বিশেষ অতিথিরা একমত হয়েছেন। যতদ্রুত সম্ভব এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন বলে উপস্থিত শ্রমিক ব্যবসায়ী সবাইকে আশ্বস্থ করেছেন।
মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে। জীবনের প্রয়োজনে জীবিকা প্রয়োজন। এটা মাথায় নিয়ে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এখানে কোন ধরনের রাহাজানি, চাঁদাবাজি ও লুটতরাজ চালানো যাবে না। মুখে এক কথা বুকে আরেক কথা তা চলতে দেওয়া হবে না। এখানে শ্রমিক কিংবা ব্যবসায়ীদেরকে কোন ধরনের হয়রানি করা যাবে না। অতীত অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। চাঁদাবাজির হাট খোলা হয়েছিল। পথে-পথে, গ্রামে-গ্রামে, যেখানেই পারে বাহিনী করে চাঁদাবাজি প্রকাশ্যে চালিয়ে রামরাজত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের পাথর কোয়ারীগুলো চালাতে হবে। যাতে ব্যক্তি চাঁদা, প্রতিষ্ঠানিক চাঁদা, অমুখ চাঁদা-তমুখ চাঁদা কোনোভাবে চলতে দেওয়া যাবে না।
সরকার তার নীতি নির্ধারক দিয়ে সরজমিন পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে যাবতীয় আইন মেনে লীজ দিয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে কোয়ারিগুলো সচল করবেন। এলাকার মানুষজন তাই প্রত্যাশা করে। তাতে করে একদিকে সরকারের রাজস্ব সমৃদ্ধ হবে। ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব দিয়ে স্বাচ্ছন্দে তাদের ব্যবসা করবেন। বিষয়টি স্থানীয় ও জাতীয় পেপার পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পৌঁছে গেছে। সরকার তার নিজস্ব গোয়েন্দা ও স্থানীয় জেলা উপজেলা প্রশাসন থেকে রিপোর্ট নিয়ে যথাযথ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন, এলাকাবাসী তাই প্রত্যাশা করে।
কিছুদিন হলো ভোলাগঞ্জ ও তামাবিল স্থল বন্দরগুলোতে চুনা পাথর কয়লা ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানী শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস এ স্থল বন্দর বন্ধ ছিলো কোভিড-১৯ এর কারণে। ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃবাণিজ্যে শত শত ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ ভারতে দীর্ঘদিন আটকা পড়েছিল। এখন খোলার সাথে সাথে বাংলাদেশের একশ্রেণির অতি উৎসাহী কাস্টমস কর্মকর্তারা কারপাস নামে আরেক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যেখানে যত টন মালামাল আসবে তত টনের কারপাস (টেক্স) দিতে হয়। কিন্তু এখানে আবার কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১৫ টন মালামাল আসলে তাতে অতিরিক্ত আরো ৫ টনের কারপাস দাবী করে বসে। এতে দারুন জটিলতার সৃষ্টি হয়। সভায় আলোচনাতে এ বিষয়টিকে বক্তারা সিলেটের এই ব্যবসাকে মার দেওয়ার জন্য অতি উৎসাহী অফিসারদের হেন কার্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
সর্বোপরি সরকারের সকল নিয়মনীতি রক্ষা করে কোয়ারীগুলোকে বৈধ লীজ প্রদানের মাধ্যমে বৃহত্তর সিলেট জেলার কোয়ারীগুলো খুলে দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ব্যবসায়ী ও নানা পরিবহনের লোকদের বাঁচাতে সরকার কি এগিয়ে আসবে?
(সংগ্রহিত)
লেখক,মো.রফিকুল হক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ